ঢাকা, শুক্রবার, ২১ আগস্ট, ২০২৬

দুই কিংবিদন্তির প্রয়াণ দিবস আজ

নায়করাজ রাজ্জাক। আজ তার চলে যাওয়ার দিন। রুপালি পর্দায় তার অনুপস্থিতে যে শূন্যতা তৈরি হয়েছে, তা নয় বছরেও পূরণ হয়নি। নবম মৃত্যুবার্ষিকীতেও দর্শকের হৃদয়ে তিনি উজ্জ্বল হয়ে আছেন। সত্তর ও আশির দশকের সাদাকালো পর্দা থেকে বর্তমানের রঙিন পর্দায় তিনি আজও স্মরণীয়। শুক্রবার (২১ আগস্ট) দেখতে দেখতে নয়টি বছর পেরিয়ে গেল। ২০১৭ সালের এ দিনে ৭৫ বছর বয়সে রাজধানীর ইউনাইটেড হাসপাতালে শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেছিলেন তিনি।


আব্দুর রাজ্জাক শুধু একজন অভিনেতা ছিলেন না, সদ্য স্বাধীন হওয়া একটি দেশের বিনোদন জগতের প্রথম এবং প্রধান পপ-কালচার আইকন ছিলেন। তিনি ঢাকাই চলচ্চিত্রের অবিসংবাদিত ‘নায়করাজ’।


তবে সময় গড়িয়েছে, কিন্তু বাংলার রুপালি পর্দায় তার রেখে যাওয়া শূন্যতা আজও পূরণ হয়নি। নবম মৃত্যুবার্ষিকীতে এসেও দর্শকের হৃদয়ে তিনি ঠিক ততটাই উজ্জ্বল, যতটা ছিলেন সত্তর বা আশির দশকের সাদাকালো কিংবা রঙিন পর্দায়। দাঙ্গার আগুন থেকে ঢাকার রুপালি পর্দায়: রাজ্জাকের গল্পটা কেবল একজন নায়কের গল্প নয়, এটি এক অদম্য সংগ্রামীরও গল্প। ১৯৪২ সালের ২৩ জানুয়ারি কলকাতার এক সম্ভ্রান্ত মুসলিম পরিবারে তার জন্ম। থিয়েটারের মঞ্চ থেকে শুরু করে মুম্বাইয়ের ফিল্মালয়ে পড়ালেখা। সিনেমার পোকাটা তার মাথায় ছোটবেলা থেকেই ছিল। কিন্তু ১৯৬৪ সালে কলকাতার সাম্প্রদায়িক দাঙ্গার ভয়াবহতা তাকে বাধ্য করে সবকিছু ছেড়ে স্ত্রী লক্ষ্মীকে নিয়ে ঢাকায় পাড়ি জমাতে।


নতুন শহর, শূন্য পকেট। রিফিউজি হিসেবে শুরু করা সে জীবন থেকে ‘নায়করাজ’ হয়ে ওঠার পথটা মোটেই সহজ ছিল না। পরিচালক আব্দুল জব্বার খানের হাত ধরে যে ইন্ডাস্ট্রিতে তার পথচলা শুরু, কে জানত একদিন সে ইন্ডাস্ট্রিই তাকে ঘিরে আবর্তিত হবে!১৯৬৬ সালে ‘১৩ নম্বর ফেকু ওস্তাগার লেন’-এ ছোট্ট একটি চরিত্র দিয়ে শুরু, এরপর জহির রায়হানের কালজয়ী নির্মাণ ‘বেহুলা’ (১৯৬৬) তাকে রাতারাতি প্রথম সারির নায়কের আসনে বসিয়ে দেয়।


সুচন্দার বিপরীতে লখিন্দর চরিত্রে রাজ্জাকের সে আবির্ভাব ঢাকাই সিনেমার মোড় ঘুরিয়ে দিয়েছিল। যেভাবে তিনি হলেন ‘নায়করাজ’: স্বাধীনতার পর ‘মানুষের মন’ দিয়ে যে ‘রাজ্জাক যুগে’র সূচনা, তা বাংলা সিনেমাকে দিয়েছিল নতুন এক মাত্রা। দর্শকনন্দিত এ অভিনেতাকে ‘নায়করাজ’ উপাধিটি দিয়েছিলেন প্রখ্যাত সাংবাদিক ও চিত্রালী সম্পাদক আহমদ জামান চৌধুরী। উপাধিটি শুধু ভালোবাসার ছিল না, এটি ছিল তার রাজকীয় আধিপত্যের স্বীকৃতি।


তিনি কেবল রোমান্টিক হিরো ছিলেন না। ১৯৭৩ সালে জহিরুল হক পরিচালিত ‘রংবাজ’ ছবির মাধ্যমে তিনি বাংলা সিনেমায় অ্যাকশন এবং আরবান ‘অ্যান্টি-হিরো’র যে ট্রেন্ড চালু করেছিলেন, তা আজও অনেক অভিনেতার কাছে পাঠ্যবইয়ের মতো। মুক্তিযুদ্ধভিত্তিক প্রথম চলচ্চিত্র ‘ওরা ১১ জন’ থেকে শুরু করে ‘জীবন থেকে নেয়া’, ‘আলোর মিছিল’, ‘ছুটির ঘণ্টা’ বা ‘অশিক্ষিত’ প্রতিটি ছবিতে তিনি নিজেকে ভেঙেছেন নতুন করে।


সোনালি জুটির রূপকার: সুচন্দা, কবরী, শাবানা এবং ববিতার সঙ্গে রাজ্জাকের জুটিগুলো ছিল ঢাকাই সিনেমার সবচেয়ে বড় সম্বল। তিন শতাধিক চলচ্চিত্রে অভিনয় এবং ১৬টি চলচ্চিত্র পরিচালনার মাধ্যমে তিনি নিজেকে পরিণত করেছিলেন এক প্রতিষ্ঠানে।


পেয়েছেন একাধিক জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কারসহ স্বাধীনতা পুরস্কারের মতো সর্বোচ্চ রাষ্ট্রীয় সম্মাননা। ব্যক্তিজীবনে স্ত্রী রাজলক্ষ্মীর সঙ্গে সুখের দাম্পত্যে তিনি ছিলেন তিন পুত্র ও দুই কন্যার জনক। বাবার নবম মৃত্যুবার্ষিকীতে পরিবারের পক্ষ থেকে কোনো আড়ম্বরপূর্ণ আয়োজন রাখা হয়নি। ছোট ছেলে খালিদ হোসেন সম্রাট জানিয়েছেন, দিনটি উপলক্ষে কুরআন খতম, বাদ ফজর বনানী কবরস্থানে জিয়ারত এবং বাদ আসর পারিবারিকভাবে দোয়ার আয়োজন করা হয়েছে।


রাজ্জাক হয়তো আজ সশরীরে নেই। কিন্তু ‘নীল আকাশের নিচে’ কিংবা ‘পিচঢালা পথ’-এ তার যে দর্পিত পদচারণা, তা বাংলা চলচ্চিত্রের ইতিহাস থেকে মুছে ফেলার সাধ্য কারও নেই। তিনি ছিলেন, আছেন এবং থাকবেন। সেলুলয়েডের ফ্রেমে অমর এক রাজা হয়ে।

ads
ads
ads

Our Facebook Page